শিশুর যত্ন

বাচ্চা খেতে চায় না ? কি বলছেন বিশেষজ্ঞরা

বেশির ভাগ মায়েরই অভিযোগ— বাচ্চা খেতে চায় না। কিছু কিছু রোগের কারণে শিশুদের রুচি কমে যেতে পারে, কিন্তু বেশির ভাগ ক্ষেত্রে ব্যাপারটা অত জটিল কিছু নয়। অনেক ক্ষেত্রেই এ বিষয়ে মা-বাবার উৎকণ্ঠা থাকে। হয়তো শিশু তার রুচি ও পরিমাণ অনুযায়ী ঠিকই খাচ্ছে, কিন্তু মা-বাবা তাতে তৃপ্ত হচ্ছেন না। শিশুর আসলে কোনো রোগ নেই, সমস্যাটা তার মনে। বয়স অনুযায়ী মানসিক ও শারীরিক বিকাশ অন্য বাচ্চাদের মতো হলে শিশুর খাওয়া নিয়ে মা-বাবার দুশ্চিন্তা করার কিছু নেই।
শিশুর প্রতি মনোযোগ কমে গেলেও সে খাওয়া কমিয়ে দিতে পারে। সে যখন দেখে যে ঠিকমতো না খেলে বা খাবার নিয়ে যন্ত্রণা করলে তাকে নিয়ে সবাই অস্থির হয়ে পড়ছে, তখন খাবার নিয়ে বায়না ধরে।


এ বিষয়ে ঢাকার শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের শিশু বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক আল আমিন মৃধা বলেন, তবে কিছু বাচ্চা আছে যারা, সত্যি সত্যি খায় না। বৃদ্ধিটাও ঠিকমতো হয় না। তাহলে দেখতে হবে যে বাচ্চাটি অপুষ্টির শিকার হচ্ছে কি না বা তার রক্তশূন্যতা হয়েছে কি না? না কি বাচ্চার ঘন ঘন কোনো সংক্রমণ হচ্ছে, যার জন্য খাওয়ায় রুচি কমে যাচ্ছে। যদি শিশুটির রক্তশূন্যতা থাকে, অপুষ্টি থাকে—বাচ্চাটি বসে থাকবে, খুব বেশি সচল থাকবে না। তাহলে এগুলো দেখতে হবে। পাশাপাশি কৃমি আছে কি না দেখতে হবে। কিছু বাচ্চার থ্যালাসেমিয়া, অ্যাজমা থাকতে পারে, কিংবা প্রস্রাবে সংক্রমণ আছে; তখন বাচ্চাটিকে পর্যবেক্ষণ করতে হবে। সে যে খায় না, তার কারণ কী খুঁজতে হবে। শুধুই কি ক্ষুধামান্দ্য নাকি সঙ্গে আর কিছু রয়েছে, সেসব দেখতে হবে। দেখে কিছু পরীক্ষা-নিরীক্ষা করাতে হবে।
খাওয়া নিয়ে বাড়াবাড়ি না করে আচরণগত পরিবর্তন আনুন
ছোট শিশুদের ক্ষেত্রে ঘুম থেকে উঠেই খিচুড়ি বা অন্য খাবার না দিয়ে আগে বুকের দুধ দিন। এর দুই-তিন ঘণ্টা পর অন্য খাবার দিন। শিশুকে যখন-তখন চিপস, জুস, চকলেট ইত্যাদি দেওয়া যাবে না, এতে খিদে নষ্ট হয়।
আহারের মধ্যবর্তী সময়গুলোতে শিশুকে অন্যান্য খাবার বেশি দেবেন না। যেমন ভাত খাওয়ার দুই ঘণ্টা আগে দুধ বা নাশতা দেবেন না। শিশুর বিদ্যালয় যদি দুপুর ১২টায় ছুটি হয়, তবে ফিরে এসে তেমন কোনো নাশতা না দেওয়াই উচিত। এ ক্ষেত্রে খিদে থাকা অবস্থাতেই ভাত বা মধ্যাহ্নভোজ দিয়ে দেওয়া যায়।


শিশুকে এক খাবার প্রতিদিন দেবেন না। যেমন রোজ ডিম সেদ্ধ না দিয়ে ডিমের তৈরি নানা জিনিস যেমন পুডিং, জর্দা ইত্যাদি দিতে পারেন। দুধের ক্ষেত্রেও তাই; পুডিং, সেমাই বা পায়েসে প্রচুর দুধ থাকে, সেটাই দিন। ফল খেতে না চাইলে কাস্টার্ড করে দিন।
অনেক সময় খাবার পরিবেশনেও ভিন্নতা আনলে কাজ হয়। রঙিন পাত্রে খাবার পরিবেশন করুন। টেবিলকে করুন সুন্দর ও আকর্ষণীয়। টিভি দেখা কমিয়ে পর্যাপ্ত খেলার ব্যবস্থা করুন, এতে খিদে বাড়বে।
সচরাচর এটাই দেখা গেছে, শিশু যদি একা খায়, তাহলে সে খুব বেশি খেতে চায় না। কিন্তু যদি সপরিবারে বসে একসঙ্গে খায়, তাহলে আপনার শিশুটিও খেতে উৎসাহ পাবে। তাই দুপুরের খাবার বা রাতের খাবার সবাই একসঙ্গে করুন।
শিশু যদি খুব অন্যমনস্ক থাকে, তাহলে খিদে নষ্ট হয়ে যায়। ধরুন, আপনার শিশুর বন্ধুরা সবাই বাইরে খেলাধুলা করছে, আর আপনি জোর করে বাড়ির মধ্যে রেখে তাকে খাওয়ানোর চেষ্টা করছেন; তাহলে কিন্তু আপনার শিশুটি একেবারেই খেতে চাইবে না।
খাবার নিয়ে জোর করবেন না। শিশুকে নিজের হাতে খেতে অভ্যস্ত করে তুলুন। খাবার প্রস্তুত, বাজার বা পরিবেশনে সম্ভব হলে তাকে সঙ্গে রাখুন। তার পছন্দমতো মাছ, মাংস বা সবজি কিনুন। এতে খাবারের প্রতি শিশুর আগ্রহ বাড়বে।
সন্তান ঠিকমতো বেড়ে উঠছে কি না, তাও নজরে রাখতে হবে। যদি দেখা যায় যে বাচ্চা সমবয়সীদের মতোই বাড়ছে, ওজনও ঠিক আছে; তাহলে বুঝতে হবে তার শরীরে পুষ্টির কোনো ঘাটতি নেই, অর্থাৎ আপনার শিশুর খাওয়াদাওয়া স্বাভাবিকই আছে। অনেক ক্ষেত্রে আবার দেখা যায়, বাচ্চার ওজন বয়সের তুলনায় বেশি অথচ মা-বাবার অভিযোগ—শিশুটি একদমই খায় না। এ ধরনের পরিস্থিতিতে মা-বাবাকে বুঝতে হবে যে শিশু যদি ঠিকঠাক না খেত, তাহলে তার ওজন বেশি হতো না। আর এরপর যদি জোর করে শিশুটিকে খাওয়ানোর চেষ্টা করা হয়, তাহলে তা শিশুটির জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। যদি দেখা যায় যে বাচ্চা ঠিকঠাক বাড়ছে না, বয়সের তুলনায় ওজন অনেক কম অথবা ওজন বয়সের তুলনায় অনেক বেশি, তাহলে কোনো শিশু বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া উচিত।

লেখক: মো. শরিফুল ইসলাম, চিকিৎসক

Tags
Show More

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button
Close