অটিজম

অটিজম কি ? লক্ষণ ও আমাদের করনীয়

স্পেশাল চাইল্ড বা বিশেষ সুবিধা সম্পন্ন শিশু

অটিজম একটি মানস্তাত্ত্বিক ও স্নায়ুবিক রোগ। স্নায়ুর বিকাশজনিত সমস্যার কারনে এ রোগ হয়ে থাকে৷ এ ধরনের রোগ বিশেষ করে বাচ্চাদের মধ্যে বেশি লক্ষ্য করা যায়। অটিজমে আক্রান্ত শিশুরা অন্য শিশুদের তুলনায় অন্যরকম আচরণ করে। এই রোগ সাধারণত এক থেকে পাঁচ বছরের শিশুদের মধ্যে দেখা যায়। অটিজমে আক্রান্ত শিশুদের স্পেশাল চাইল্ড ও বলা হয়ে থাকে।
অটিজম একটি জন্মগত রোগ। অর্থাৎ, শিশু মায়ের গর্ভ থেকে এই রোগ নিয়ে আসে এবং শিশুট বয়স বাড়ার সাথে সাথে এই রোগের লক্ষণ আরও স্পষ্ট হয়ে প্রকাশ পেতে থাকে। অটিজমে আক্রান্ত শিশুর বাবা মা অন্য শিশুদের সাথে নিজের বাচ্চার আচরন একটু খেয়াল করলেই বুঝতে পারবেন বাচ্চার সমস্যা৷ এ ধরনের শিশুদের মানুষের সাথে যোগাযোগের ক্ষেত্রে থাকে সীমাবদ্ধতা। এ রোগের বিভিন্ন ধরন রয়েছে। যেমন-

(ক) ক্লাসিক অটিজম অটিস্টিক ডিজঅর্ডারঃ এটি অটিজমের সাধারন একটি ধরন। এসকল ধরনের রোগীদের সাধারণত ভাষাগত সমস্যা হয়ে থাকে। ভাষা ভালোভাবে প্রকাশ পেতে বাধা পায় বলে এদের মাঝে অস্বাভাবিক আচরন ও প্রতিবন্ধকতা তৈরি হয়ে যায়। এছাড়া এদের বুদ্ধিগত ক্ষমতা কম থাকায় বাহ্যিকটা অন্যরকম হয়ে থাকে।

(খ) Asperger’s সিন্ড্রমঃ এধরনের রোগে কিছুটা লক্ষণ প্রকাশ পায়। এদের আচরন সাধারণ অস্বাভাবিক ও প্রতিবন্ধকমূলক হয়। তবে ভাষা বা বুদ্ধিবৃত্তিক দিক থেকে তারা কিছুটা সুস্থ হয়।

(গ) পারভেসিব ডেভেলপমেন্টাল ডিজঅর্ডারঃ এদের রোগ নির্নয় কঠিন হয়ে থাকে তুলনামূলক। এদের মাঝে এরপারজার সিন্ড্রোম ও অটিস্টিক ডিজঅর্ডার এর কিছু লক্ষণ থাকে। তবে অনেকসময় অনেক লক্ষণ প্রকাশ পায় না।

অটিজম রয়েছে এমন শিশুর মধ্যে মূলত দুই ধরনের বিশেষ বৈশিষ্ট্য দেখা যায়:
* সামাজিক সম্পর্ক তৈরিতে অসুবিধা এবং আশপাশের পরিবেশ ও ব্যক্তির সঙ্গে যোগাযোগের সমস্যা
* বারবার একই ধরনের আচরণ করা অটিজম বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন ব্যক্তি বা শিশুরা সামাজিকতা পালন করতে পারে না, নিজের আগ্রহ, আবেগ আর অনুভূতি অপরের সঙ্গে শেয়ার করতে পারে না, যেকোনো ধরনের সামাজিক সম্পর্ক শুরু করার জন্য নিজে থেকে কোনো উদ্যোগ গ্রহণ করে না এবং যদি সে কথা বলতেও পারে, তবু আরেকজনের সঙ্গে কথাবার্তা চালিয়ে যেতে ব্যর্থ হয়। কেউ কেউ ঠিকমতো কথা বলতে পারে না বা একেবারেই কোনো অর্থবোধক শব্দ উচ্চারণ করতে পারে না। নাম ধরে ডাকলে সাড়া দেয় না, চোখে চোখ রেখে তাকায় না এবং পরিবেশ অনুযায়ী মুখভঙ্গির পরিবর্তন করে না, অর্থাৎ ভয় পেলে বা খুশি হলে মুখ দেখে বোঝা যায় না। অটিজম আছে এমন শিশুরা কল্পনা করে খেলে না। যেমন নিজেকে কোনো চরিত্র ভেবে বা কোনো সাধারণ বস্তুকে গাড়ি বা প্লেন বানিয়ে খেলতে পারে না।

সহজে বন্ধু তৈরি করতে পারে না এবং অপরের বিষয়ে তাদের আগ্রহ কম তৈরি হয়। একই ধরনের আচরণ বারবার করতে পারে। যেমন হাতে তালি দেওয়া, মেঝেতে ঘুরতে থাকা, বারবার আঙুলের সঙ্গে আঙুল প্যাঁচানো। কখনোবা একটি বস্তুকে বারবার একই রকমভাবে ব্যবহার করা। যেমন খেলনা গাড়ির চাকা বারবার ঘোরানো, কখনোবা একই শব্দ বারবার উচ্চারণ করা। অটিজম আছে এমন যারা কথা বলতে পারে, তারা দেখা যায় একই প্রশ্ন বারবার করছে বা প্রশ্নকর্তার প্রশ্নটিই বারবার উচ্চারণ করছে। যেমন যদি তাকে জিজ্ঞেস করা হয়, ‘তোমার নাম কী?’ তবে সে নিজের নাম না বলে বলতে থাকে—‘তোমার নাম কী? তোমার নাম কী? তোমার নাম কী?’—এই ধরনের বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন শিশুরা রুটিন বা প্যাটার্ন মেনে চলতে পছন্দ করে, রুটিনের ব্যতিক্রম হলে রেগে যায় বা মন খারাপ করে। অনেক সময় একই চিন্তা বা একই কাজ বারবার করার অভ্যাস থাকে, আবার কখনো একটি বিশেষ বস্তুর প্রতি অতিরিক্ত আকর্ষণ তৈরি হয়। যেমন খেলনা গাড়ি, চশমা, কলম ইত্যাদি সংগ্রহ করতে চায়। শব্দ বা স্পর্শের প্রতি অস্বাভাবিক সাড়া দেয়। যেমন অল্প শব্দেই ভীত হয়ে পড়ে বা অনেক জোরের শব্দেও কোনো প্রতিক্রিয়া হয় না, তেমনি অল্প স্পর্শেই ব্যথা পায় বা অস্বস্তিবোধ করে, আবার উল্টোটাও হতে পারে, অনেক ব্যথা পেলেও কাঁদে না।

অটিজম বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন শিশুদের মধ্যে খিঁচুনি (মৃগী), অতিচঞ্চলতা (হাইপার অ্যাক্টিভিটি), বুদ্ধির ঘাটতি, হাতের কাজ করতে জটিলতা, হজমের সমস্যা, দাঁতের সমস্যা, খাবার চিবিয়ে না খাওয়া ইত্যাদি সমস্যা থাকতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের সেন্টার ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশন (সিডিসি) পরিচালিত সর্বশেষ জরিপ (২০১৮ সালে প্রকাশিত) অনুযায়ী দেখা যায়, প্রতি ৫৯ জন শিশুর মধ্যে ১ জনের অটিজম রয়েছে। মেয়েশিশুদের তুলনায় ছেলেশিশুদের অটিজমের বৈশিষ্ট্য থাকার আশংকা প্রায় ৪ গুণ বেশি। বিগত ৪০ বছরে সারা বিশ্বে অটিজমের হার বেড়েছে প্রায় ১০ গুণ। এর মূল কারণ, বারবার অটিজমের সংজ্ঞা পরিবর্তন হয়েছে, ফলে অটিজমের বৈশিষ্ট্যের পরিধি বেড়েছে। আমাদের দেশে এখনো এ ধরনের রেগীকে সহজে মেনে না নেয়ার প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়। কিন্তু এধরনের রোগীর প্রতি আমাদের সকলের সদয় থাকা প্রয়োজন। অনেকসময় বাবা মা মেনে নিতে চান না সন্তানের রোগের বিষয়টি ফলে দীর্ঘ সময়ের বিভ্রান্তিতে তা৷ আরও জটিল পর্যায়ে এসে পৌছায়।

অটিজমের কোন লক্ষণ প্রকাশমাত্র চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে এবং বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী পরিচর্যা, শিক্ষা, প্রশিক্ষণ আর প্রয়োজনে বিশেষ কিছু সমস্যার ওষুধ সেবন করতে হবে। পৃথিবীর সব উন্নত দেশেই সীমিত আকারে ওষুধের প্রয়োগ রয়েছে। এই ওষুধ তাকে প্রশিক্ষণের উপযোগী করে তুলবে এবং সহযোগী সমস্যাকে কমাবে। তবে অবশ্যই বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে ওষুধ খাওয়াতে হবে। অটিজম বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন শিশুদের পরিচর্যার জন্য যে বিষয়গুলোর প্রতি বিশেষ মনোযোগ দিতে হবে তা হলো:

১) বাবা–মায়ের প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ
২) শিক্ষক, চিকিৎসক, থেরাপিস্টসহ সবাইকে সম্মিলিতভাবে পরিচর্যায় অংশ নেওয়া
৩) কাঙ্ক্ষিত আচরণের জন্য শিশুকে উৎসাহিত করা
৪) শুরুতে সাধারণ মূলধারার স্কুলে প্রেরণ
৫) স্কুলের পাশাপাশি বাড়িতেও শিশুকে সামাজিক রীতিনীতি শেখানোর চেষ্টা
৬) সামাজিক অনুষ্ঠানে শিশুর অংশগ্রহণ
৭) শিশুর উৎসাহের বিষয়টিকে গুরুত্ব দেওয়া, সেটির চর্চা করা (যেমন ছবি আঁকা, গান গাওয়া, খেলাধুলা ইত্যাদি
৮) প্রয়োজনে বিশেষায়িত স্কুলের সাহায্য নেওয়া
৯) ভাষার দক্ষতা বাড়ানোর চেষ্টা (স্পিচ থেরাপি), প্রয়োজনে ইশারা ভাষা শেখানো
১০) অকুপেশনাল থেরাপি (দৈনন্দিন কাজ, বৃত্তিমূলক কাজ ইত্যাদি শেখানো)
১১) সাইকোথেরাপি, প্লে–থেরাপি, সেনসরি ইন্টিগ্রেশন (সংবেদনশীলতা বাড়ানোর কৌশল) ইত্যাদি
১২) সমস্যা অনুযায়ী কিছু ওষুধ প্রদান, তবে তা অবশ্যই বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী।

 

আমাদের পরবর্তী টিপস পেতে যুক্ত থাকুন আমাদের ফেসবুক পেইজে Mamoniya মামোনিয়া

আরো পড়ুন > টিনেজারদের সাথে বাবা মায়ের যে কাজগুলা অবশ্যই করা উচিত

Show More

Leave a Reply

Your email address will not be published.